ইন্টারনেট সেফটি; আপনার টিনএজ সন্তানের নিরাপত্তায় করণীয়

ইন্টারনেট সেফটি

সাইবার বুলিং, ইন্টারনেটের খারাপ সাইটে ছবি ও ফোন নাম্বার, আইডি হ্যাকড, ব্ল্যাকমেইলিং; একবিংশ শতাব্দির আধুনিক যুগে এই ঘটনাগুলোর সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। আপনার সাথে কিংবা আপনার পরিচিত কারোর সাথে এমন ঘটনা ঘটেছে কিংবা এমন ঘটনা আপনি শুনেছেন। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ইন্টারনেটে বিপদগুলো কেন ঘটে? আমাদের ব্যক্তিগত ছবি কীভাবে অনেক হাতে পৌঁছে যায়? কখনো ভেবেছেন, এইসবের জন্য আমরাই দায়ী কি না? ইন্টারনেট সেফটি ’র জন্য আমরা কী কী করতে পারি?

এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে টিনএজাররা। কী করবেন? ইন্টারনেট থেকে সন্তানকে দূরে রাখবেন? কিন্তু আধুনিকায়নের এই যুগে চাইলেই কি তা সম্ভব? আধুনিকতার জন্মই আমাদের ভালোর জন্য। আর নতুনের প্রতি মানুষের আগ্রহতো সবসময় সব মানুষের মাঝেই ছিলো। সেভাবে ইন্টারনেট আসায় আমাদের আগ্রহও বেড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। সবচেয়ে বেশি আগ্রহ বেড়েছে টিএজারদের। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক দিকগুলোর শিকারও টিনএজাররাই বেশি হচ্ছে।

আমার ভাগনির গল্পটাই বলি। সুপ্তি মাত্র দশম শ্রেণীতে পড়ে। নিজের স্মার্টফোন নাই। কিন্তু সময় পেলে গেমস খেলা বা গান শোনার অজুহাতে তার মায়ের বা বাবার ফোন নিতো। এভাবেই বাবা-মার অজান্তেই ফেসবুক একাউন্ট ও ইন্সট্রাগ্রাম একাউন্ট খোলে। কয়েকদিন আগে ওর মায়ের ফোন দিয়ে ফেসবুক চালিয়ে লগ আউট করতে ভুলে যায়। সুপ্তির মা ফোন হাতে নিয়েতো অবাক! মেয়ে শুধু ফেসবুক খুলেছে তা না। অন্য একটি আইডির সাথে নিজের অনেক ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য আদানপ্রদানও করেছে। ভাবুন তো, সুপ্তির ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে অন্য আইডির লোকটি কী কী করতে পারতো? কতটা বিপদগ্রস্থ হতে হতো সুপ্তির পরিবারকে? কিন্তু আশার কথা এমন কিছু ঘটেনি। তার আগেই সুপ্তির মা বিষয়টা জেনে যায় ও সুপ্তিকে ইন্টারনেট সেফটি’র বিষয়টি বুঝিয়ে বলে।

টিএনএজ সন্তান ইন্টারনেট ব্যবহার করুক! এতে বাঁধা দিতে গেলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। কারণ প্রযুক্তি আমাদের এতটাই কাছে চলে এসেছে যে, আপনি ধমক দিয়ে কিংবা বল প্রয়োগ করে আপনার সন্তানকে ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখতে পারবেন না। তবে আপনি যেটা পারবেন তা হলো, আপনার সন্তানকে সচেতন করা। ইন্টারনেট ব্যবহার করেও কীভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় তা শেখানো।

আজকে আমরা টিনেজারদের ইন্টারনেট সেফটি নিয়ে আলোচনা করবো।

নিজের সব তথ্য উন্মুক্ত নয়

যদি ফেসবুকই ধরি সেখানে একটা আইডি খুলতে কী কী লাগে? নাম, ঠিকানা, স্কুলের ঠিকানা ও আরো অনেক কিছু। মজার বিষয় হচ্ছে এই তথ্যগুলো সবই উন্মুক্ত। পৃথিবীর যে কেউ যে কোন প্রান্ত থেকে আপনার এই তথ্যগুলো দেখতে পারবে। এবং চেষ্টা করলে আপনাকে খুঁজে বের করা কোন কঠিন কিছু হবে না। আমেরিকান ফেডারেল ট্রেড কমিশন বলছে, ফেসবুক বা এমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের পুঙ্খানুপুঙ্খ ঠিকানা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে। মেসেঞ্জারে অপরিচিত কারো কাছেতো একদমই না। বেশিরভাগ টিনেজাররাই পরিস্থিতি পড়তে পারে না। সাময়িক আবেগ কিংবা কোন কিছু না ভেবেই অপরিচিত কারো কাছে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করতে পারে। সেজন্য আপনার সন্তানকে এই বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে বলবেন।

পাসওয়ার্ড ও ইউজারনেম একান্ত ব্যক্তিগত

শুনতে হয়তো আপনার কাছে অবাক লাগতে পারে! কিন্তু সত্যটা হচ্ছে বেশিরভাগ টিএজাররা কোন ধরণের চিন্তা না করেই নিজের পাসওয়ার্ড ও ইউজারনেম বন্ধু কিংবা অন্য কারোর সাথে শেয়ার করে। টিনএজাররা আবেগের বশবর্তি হয়ে প্রেমেও জড়াতে পারে সোস্যাল মিডিয়ায়। বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডের সাথে পাসওয়ার্ড শেয়ার করার ঘটনা অহরহই হয়। এক্ষেত্রে তার আইডি দিয়ে অন্য কেউ যেকোন ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু করতে পারে। ফলে নেতিবাচক কিছু ঘটলে কিন্তু আপনার সন্তানের সাথেই ঘটবে। সুতরাং কোন ক্ষেত্রেই কারো সাথে পাসওয়ার্ড শেয়ার না করার ব্যাপারে সন্তানকে অবশ্যই সচেতন করবেন।

লাইক! কমেন্ট! শেয়ার! না বুঝেই নয়

ফেসবুকে কে আমাকে চেন! কী এমন হবে, করে দিলে একটা বাজে কমেন্ট! এমন ধারণা আমাদের অনেকের মাঝেই আছে। আপনি ফেসবুক ব্যবহার করলে হয়তো খেয়াল করবেন, কমেন্টে আক্রমণাত্মক আচরণ করা, কাউকে গালি দেয়া একটা খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর শেয়ারতো আরেকটা মহামারী বলা যেতে পারে। নেতিবাচক বা ইতিবাচক যাই দেখুক না কেন, একটু জাকজমক কিংবা চোখে লাগার মতো বিষয় হলে শেয়ারতো করতেই হবে! এই ধারণা থেকে বের হতে হবে। চোখের সামনে যাই পড়বে তাই শেয়ার নয়। আগে ভালোভাবে জেনে বুঝে তারপর শেয়ার করার যোগ্য হলে করা যাবে। শেয়ার বাটনে একটা চাপেই একটা ভুয়া খবরও পৌঁছে যেতে পারে হাজার হাজার মানুষের কাছে। ঘটতে পারে বড় কোন বিপর্যয়, ক্ষতি হতে পারে অন্যের ও নিজেরও।

ভার্চুয়াল মানুষদের সাথে দেখা করার ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে

ফেসবুকে পরিচয়। দেখা করতে গিয়ে অপহরণের শিকার কিংবা ধর্ষনের শিকার কিংবা হয়রানীর শিকার! এমন ঘটনা কয়েকদিন পর পর পত্রিকায় কিংবা খবরে দেখা যায়। আচ্ছা বলুন তো, কোন বিশেষ কারণ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে অপরিচিত একজন মানুষের সাথে দেখা করতে যেতে হবে কেন? এই বিষয়ে বিশেষ নজর দিন। সন্তানকে ভালো করে বোঝাতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে যেকোন কিছু হতে পারে। হ্যাঁ, কোন সেলিব্রেটি কিংবা ইনফ্লুয়েন্সারের সাথে দেখা করতে যাওয়া যেতে পারে। তবে দেখা করতে যাওয়ার কারণও যেন স্পষ্ট থাকে। কোন পাবলিক ইভেন্ট না হলে পরিবারের কাউকে সাথে নেয়াই উত্তম।

সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলুন

আপনি সন্তানকে ধমক দিলেন। জোর করে ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখলেন। কিন্তু কতদিন? বাসার কম্পিউটার কিংবা স্মার্টফোন দিয়ে কোন না কোনভাবে সে ইন্টারনেটের জগতে প্রবেশ করতেই পারে। সেক্ষেত্রে আপনি মোটেও জানতে পারবেন না, সে কী করছে! কোন বিপদে পড়ছে কি না! আপনি যদি তাকে ধমক দেন কিংবা জোর করেন দূরে রাখার চেষ্টা করেন তাহলে জেনে রাখুন সে আপনাকে কিছুই জানাচ্ছে না। তারচেয়ে বরং সন্তানের সাথে আলোচনা করুন না। ইন্টারনেটের ভালো দিক, খারাপ দিক, ইন্টারনেটের নিরাপত্তা, আসক্তি ইত্যাদি নিয়ে। তাহলে দেখবেন, সন্তান সচেতনতো হবেই সাথে নিজেই তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কার্যক্রম নিয়ে আপনার সাথে আলোচনা করবে।

ইন্টারনেটের খারাপ দিক ও ভালো দিক দুটোই আছে। আমরা কোন দিকটা নিবো সেটাই আসল। ইন্টারনেট সেফটি ঠিকঠাকভাবে মেনে চললে ইন্টারনেটের খারাপ দিকটি এড়িয়ে চলা সম্ভব আমাদের  পক্ষে।

আপনার সন্তানের অবসরকে সুন্দর, আনন্দময় ও শিক্ষণীয় করে তুলতে তাকে বিজ্ঞানবাক্স দিন। বিজ্ঞানবাক্স কিনতে এখানে ক্লিক করুন।

89 total views, 1 views today

What People Are Saying

Facebook Comment