Show Categories

নোবেল পুরষ্কার ২০১৭ এবং কিছু তথ্য (১ম পর্ব)

Bigganbaksho nobel prize winner

১৮৯৫ সালে সুয়েডীয় বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের করে যাওয়া একটি উইল-এর মর্মানুসারে ও তার নামে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয়। গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবস্বার্থে অবদানের জন্য ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তিত হয়। শান্তি, সাহিত্য, পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসা সহ মোট পাঁচটি বিভাগে শুরুতে পুরস্কৃত করা হলেও ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতি সহ সর্বমোট ছয়টি বিভাগে পুরস্কার প্রধান করা হয়।

নোবেল পুরস্কারকে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত করা হয় এবং পুরস্কারপ্রাপ্তদের নোবেল লরিয়েট বলা হয়। স্টকহোম, সুইডেনে এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও শুধুমাত্র শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় অসলো, নরওয়ে থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর পুরস্কার প্রদান বন্ধ ছিল। পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেকে একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ ও নোবেল ফাউন্ডেশন থেকে কিছু পরিমান অর্থ পেয়ে থাকেন। ২০১২ সালে এই অর্থের পরিমান ছিল ৮০ লক্ষ্য সুইডিশ ক্রোনা। নোবেল পুরস্কার মৃত কাউকে দেয়া হয়না এবং লরিয়েটকে অবশ্যই পুরস্কার প্রদানের সময় জীবিত থাকতে হবে। কিন্তু খুব বেশী অবদানের জন্য মাঝেমধ্যে এর ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। নোবেল পুরস্কারের দায়িত্বে আছে সুইডিশ অ্যাকাডেমি, সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি, নোবেল কমিটি অফ কারোলিন্সকা ইন্সিটিউট ও নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি

চলুন জেনে আসি ২০১৭ সালে নোবেল বিজয়ীদের কিছু তথ্য-

 শান্তিতে ICAN

মুহাম্মদ ইউনুস, মাদার তেরেসা, মালালা ইউসুফজাই কিংবা নেলসন মেন্ডেলা এই নাম গুলো শুনলেই বোঝা যায় নোবেল শান্তি পুরস্কারের গুরুত্ব। ১৯০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ১৩১ ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান কে এই পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়। পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদানের জন্য নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি’র মনোনয়নে বিভিন্ন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। নোবেল শান্তি পুরস্কার কে বা কারা পাবে এই নিয়ে সারা বিশ্বেই প্রবল আগ্রহ থাকে। ২০১৭ সালে শান্তিতে নোবেল লাভ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবলিশ নিউক্লিয়ার ওয়েপনস (ICAN)। পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ এবং এই অস্ত্রকে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করার ফলস্বরূপ এই প্রতিষ্ঠানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়।

আরও জানুন- ‘স্যাটেলাইট যুগে বাংলাদেশ’ বঙ্গবন্ধু-১

২০০৭ সালের ২৩ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ও ৩০ এপ্রিল অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় পৃথক দুটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা হয় যার সদর দফতর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। অলাভজনক এই সংগঠন ১০১টি দেশের ৪৬৮টি সহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নোবেল কমিটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, মানব সভ্যতার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র কি পরিমাণ মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে সে বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এই সম্মাননা দেয়া হয়েছে। তাদের চেষ্টার ফলে এ পর্যন্ত ১০৮টি দেশ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর আইক্যানের নির্বাহী পরিচালক বেটরিস  কেইন বলেন, আইক্যানের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমাণু অস্ত্র বহনকারী দেশগুলোর কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়া যে, তারা যে পরমাণু অস্ত্রের উপর নির্ভর করছে তা অশান্তিকর আচরণ। নিরাপত্তার অজুহাতে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার মতো কোনো অস্ত্র মেনে নেয়া যায়না।

 অর্থনীতিতে রিচার্ড থেলার

Richard Thaler

১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তিত হলেও তখন শুধুমাত্র অর্থনীতি ছাড়া বাকি পাঁচ বিভাগে পুরস্কার প্রদান করা হতো। পরবর্তীতে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিনশত বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ১৯৬৮ সালে অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানে অবদানের জন্য একটি পুরস্কার প্রবর্তন করে। ১৯৬৯ সাল থেকে The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel নামে প্রতিবছর অর্থনীতি বিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। সুইডেনের রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স পুরস্কার প্রদানের বিষয়টি পরিচালনা করেন। অর্থনীতিতে সর্বপ্রথম যৌথভাবে নোবেল লাভ করেন রাগনার ফ্রিশ ও জ্যান টিনবারগেন। প্রথম বাঙ্গালী হিসেবে অমর্ত্য সেন ১৯৯৮ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

আরও জানুন- শিশুর ঘুম নিয়ে চিন্তিত? দেখে নিন সমাধান

২০১৭ সালে অর্থনীতিতে অসামান্য অবদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ রিচার্ড থেলার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। বিহ্যাভিয়রাল ইকোনমিকস বা আচরণগত অর্থনীতিতে সফল গবেষণার জন্য তিনি এই সম্মান পেলেন। নোবেল কমিটির মতে, অর্থনীতি ও ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহনের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে রিচার্ড থেলারের সার্বিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে। সীমিত মিতব্যয়িতা, সামাজিক অগ্রাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাবের মতো বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এগুলো কিভাবে বাজারের ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে মানুষের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তা দেখিয়েছেন অধ্যাপক থেলার। শিকাগো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিচার্ড থেলার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মনস্তত্তের প্রভাব নিয়ে কাজ করে আগেই আলোচনায় ছিলেন। সামাজিক অভিরুচির ক্ষেত্রে থেলার হাজির করেন ন্যায্যতার প্রসঙ্গ।উচ্চ চাহিদার সময়ে ভোক্তাদের ন্যায্যতা বিষয়ে সচেতনতা পন্যের মূল্য বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। থেলারের লেখা ‘নাজ’ বইটি সব ধরনের মানুষের প্রশংসা অর্জন করেছে। ৭২ বছর বয়সী থেলার আচরণগত অর্থনীতির তাত্ত্বিক হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছেন। প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যু বার্ষিকীতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পুরস্কার হিসেবে একটি সনদপত্র, একটি স্বর্ণপদক ও অর্থমূল্য প্রদান করা হয়।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করায় নোবেল

পদার্থ বিজ্ঞানে অসাধারণ অবদানের জন্য প্রতিবছর রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স নোবেল পুরস্কার প্রদান করে থাকে। ভিলহেল্ম কনরাড রন্টগেন পদার্থ বিজ্ঞানের সর্বপ্রথম নোবেল লরিয়েট। ১৯০১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ২০৬ জনকে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়। প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যু বার্ষিকীতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পুরস্কার হিসেবে একটি সনদপত্র, একটি স্বর্ণপদক ও অর্থমূল্য প্রদান করা হয়।

২০১৭ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের তিন পদার্থবিদ রেইনার ওয়েস, ব্যারি সি ব্যারিসকিপ এস থ্রোনআলবার্ট আইনস্টাইন-এর অপেক্ষবাদ তত্তের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে সফল গবেষণার জন্য তাঁদের এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়। মার্কিন এই তিন পদার্থবিদের গবেষণায় অপেক্ষবাদ তত্তের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বাস্তবে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারীতে ব্ল্যাক হোলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করার যুগান্তকারী ঘোষণা দেওয়া হয়। অ্যাস্ট্রোনমি ম্যাগাজিন তাদের এক গবেষণায় বলে, আইনস্টাইন একসময় নিজেও এই তত্ত নিয়ে সন্দিহান ছিলেন এবং সত্তর দশকের অনেক বিজ্ঞানী এই তরঙ্গ সনাক্ত করা সম্ভব কিনা সে বিষয়ে অনিশ্চিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েব অবজারভেটরি(এলআইজিও)-এর অধীনে গত বিশ বছর ধরে এক হাজারের বেশী গবেষক আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছিলেন। তাদের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল কমিটি রেইনার ওয়েস, ব্যারি সি ব্যারিস ও কিপ এস থ্রোনকে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেয়। রেইনার ওয়েস ১৯৩২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জার্মানির বার্লিনে জন্মগ্রহণ করেন, ব্যারি সি ব্যারিস ১৯৩৬ সালের ২৭ জানুয়ারী যুক্তরাষ্ট্রের ওমাহা ও কিপ এস থ্রোন যুক্তরাষ্ট্রের লগানে ১৯৪০ সালের জুন মাসের ১ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।

আরও জানুন- নোবেল পুরষ্কার ২০১৭ এবং কিছু তথ্য (শেষ পর্ব)

 

 

 

 

185 total views, 1 views today

What People Are Saying

Facebook Comment