Show Categories

নোবেল ২০১৯; পৃথিবী বদলে দেয়ার স্বীকৃতি পেলেন যারা

নোবেল

১৮৯৫ সালে সুইডিশ রসায়নবিদ ও বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল তার একটা উইলে সারাবিশ্বে যথাক্রমে চিকিৎসাবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, সাহিত্য ও শান্তিতে অবদানের জন্য একটা পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়ে যান। এই পুরস্কারটি নোবেল পুরস্কার হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৮ সালে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নোবেল ফাউন্ডেশনকে একটা বিরাট অংকের অর্থ অনুদান দেন নতুন একটা পুরস্কার প্রদানের জন্য। সেই ধারাবাহিকতায় নোবেল কমিটি তার পরের বছর থেকে পূর্বের ৫ টি পুরস্কারের সাথে অর্থনীতিতে নোবেল দেয়ার মাধ্যমে মোট ৬ টি শাস্ত্রে নোবেল প্রদান করে যাচ্ছেন। ১৯০১ সাল থেকে প্রায় প্রতি বছরই এইসব শাস্ত্রে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এই পুরস্কার স্থগিত ছিলো। নোবেল পুরস্কারকে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নোবেল পুরস্কার তাঁদেরকেই দেয়া হয় যাঁরা নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দিতে সাহায্য করেন। সেজন্য যাঁরা নোবেল পুরস্কার পান তাদেরকে নোবেল লরিয়েট বলা হয়।  বাংলাদেশ থেকে ২০০৬ সালে গ্রামীন ব্যাংক ও গ্রামীন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা  ড. মুহম্মদ ইউনুসকে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
আসুন জেনে নেই ২০১৯ সালে কোন কোন অবদানের জন্য কারা কারা পেলেন এই সম্মানজনক পুরস্কার।

চিকিৎসা; অক্সিজেনের সাথে কোষের মানিয়ে নেয়ায় প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য নোবেল

আমাদের দেহের কোষগুলোর সঠিকভাবে শরীরবৃত্তিয় কাজ সম্পন্ন করতে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। যদি কখনো অক্সিজেনের পরিমাণ কম হয়, তখন কোষগুলো কম অক্সিজেনের সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নেয়। এবং অপর্যাপ্ত অক্সিজেনের জন্য নিজেদের কাজের প্রক্রিয়াও পরিবর্তন করে ফেলে। কখনো কখনো বাড়তি অক্সিজেন সরবরাহের জন্য তারা আমাদেরকে জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে চাপ দেয়। এজন্য একটু বেশি শারীরিক পরিশ্রমের সময় বা কোষ সংক্রান্ত রোগের ক্ষেত্রে এজন্য আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায়। আর এভাবে যদি কোষগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পায় তাহলে তারা সবাই মিলে আমাদের শরীরে টিস্যুর গঠন পরিবর্তন করে দেয়। বাড়তি লোহিত কণিকা ও নতুন রক্তনালী তৈরি করার চেষ্টা করে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়াতে চেষ্টা করে। যদিও আমরা জানতাম, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে পাওয়া অক্সিজেনই মূলত লোহিত কণিকাকে রক্তনালীর মাধ্যমে কোষে কোষে পৌঁছে দেয়। কিন্তু এবার চিকিৎসায় নোবেল পাওয়া তিন বিজ্ঞানী গবেষণা করে দেখলেন যে, ইরাইথ্রোপোয়েটিন নামে একটা হরমোন তৈরি হলেই শরীরে লোহিত কণিকার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর এই হরমোনটি তৈরি করার প্রয়োজনীয় সবকিছু কোষের মধ্যেই বিদ্যমান আছে। সংকটাপন্ন পরিবেশে পড়লেই কোষ এই হরমোনটি তৈরি করার চেষ্টা করে।

এই গবেষণাটি করেই এবার চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পান স্যার পিটার জে র‍্যাটক্লিফ, উইলিয়াম জি কেলিন জুনিয়র ও গ্রেগর এল সেমেনজা।

এই আবিষ্কারের ফলে ক্যান্সারের কোষগুলোর কার্যক্ষমতার প্রভাব স্বাভাবিক কোষে পড়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে। একই সাথে শরীরের রক্তস্বল্পতার সমাধান হিসেবে কাজ করবে এই প্রক্রিয়া। এজন্য মানুষের শরীরে ইরাইথ্রোপোয়েটিনের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ঔষধ তৈরির কাজও চলছে।

পিটার জে র‍্যাটক্লিফ ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ডিরেক্টর। কাজ করছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবেও।

স্যার উইলিয়াম জি কেলিন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা শাস্ত্রের অধ্যাপক। ক্যান্সার গবেষণা নিয়ে কাজ করেন ডানা ফার্বার ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের সাথে।

স্যার গ্রেগর এল সেমেনজা কাজ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অপ মেডিসিনের অধ্যাপক হিসেবে।

তাদের তিনজনের এই আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানের আমাদের সফলতার সম্ভাবনা আরো বাড়িয়ে দিবে। রোগের বিরুদ্ধে লড়তে আমাদেরকে করে তুলবে আরো শক্তিশালী।

মোবাইল ব্যাটারি এনে দিলো রসায়নে নোবেল

হ্যাঁ, আমাদের হাতে থাকা মোবাইলে ছোট লিথিয়াম ব্যাটারির আবিষ্কার ও এর উন্নয়নে কাজ করার জন্যই এই বছরে রসায়নে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী জন বি গুডএনাফ, এম স্ট্যানলি হুইটিংগাম ও আকিরা ইয়োশিনো।

তাদের যাত্রাটা শুরু হয় ১৯৭০ সালে। আমেরিকায় তখন জ্বালানী তেলের বিরাট সংকট। শুরু হলো অভাব। আর এই অভাব থেকেই বিকল্প খোঁজার অভিযান। শুরুটা করেছিলেন স্ট্যানলি হুইটিংগাম। লিথিয়াম দিয়ে তৈরি করেছিলেন এক ধরণের ব্যাটারি। কিন্তু এই ব্যাটারি কিছুক্ষণ ব্যবহারের পরই বিস্ফোরিত হয়ে যেতো। টুকটাক আরো কিছু কাজ করে কিছুটা অবসর নিলেন এই বিজ্ঞানী। ঠিক তার ১০ বছর পরে ১৯৮০ সালে জন বি গুডএনাফ আবার নতুন করে কাজ শুরু করেন। প্রয়োজনীয় বেশ কিছু পরিবর্তন এনে কাজকে আরো কিছুটা এগিয়ে নেন তিনি। গবেষণায় শেষ আঁচড়টি দেন জাপানি বিজ্ঞানী আকিরা ইয়োশিনো। ১৯৮৫ সালে আরো বেশ কিছু পরিবর্তন এনে বিস্ফোরণের সম্ভাবনা প্রায় কমিয়ে নিয়ে আসেন তিনি। আর ১৯৯১ সালে পুরোদস্তুর ব্যবহারের জন্য উপযোগী করে প্রথম লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি বাজারে আনে জাপানি কম্পানি সনি।

আর এরপর তড়িৎ প্রকৌশলীরা লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি দিয়ে রীতিমত বিপ্লব তৈরি করে বসেন। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে কী কাজে লাগে না এই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি! মোবাইল, ল্যাপটপ, ক্যামেরা; কী চলে না এই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি দিয়ে! প্রযুক্তিবিদরা এই লিথিয়াম ব্যাটারি দিয়ে গাড়িও বানিয়ে ফেলেছেন। কোথাও কোথাও পুরো একটি বাড়িই চলে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির শক্তিতে।

এমন অসাধারণ এক আবিষ্কারের জন্য নোবেলতো অবধারিতই ছিলো!

স্যার জন বি গুডএনাফ গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্ট্যালনি হুইটিংগাম কাজ করেন নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। আর আকিরা ইয়োশিনো কর্মরত আছেন জাপানের আসাই কাসেই কর্পোরেশনে, শিক্ষকতা ও গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন জাপানেরই মেইজো বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স স্বপ্ন দেখে, একদিন আমাদের দেশ থেকেও কেউ জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য দেশে-বিদেশে নোবেলের মতো পুরস্কারে ভূষিত হবে। আপনার সন্তানকে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে, তার সৃজনশীলতাকে বাড়িয়ে দিতে তাকে বিজ্ঞানবাক্স দিন।  অনলাইনে বিজ্ঞানবাক্স কিনতে এখানে ক্লিক করুন।

28 total views, 2 views today

What People Are Saying

Facebook Comment