আপনি কি শুধুই বাবা নাকি সুপারম্যান বাবা? এটা কোন প্রশ্ন হলো! পৃথিবীর সব বাবাই তো সন্তানের কাছে সুপারম্যান বাবা। যে সন্তানের জন্য সবকিছু করতে পারে। কিন্তু! কিন্তু, আমাদের বাবারা একটু অন্যরকম সুপারম্যান। একটু গম্ভীর, একটু কঠিন কিংবা একটু বাস্তববাদী সুপারম্যান! দায়িত্ব আর কর্তব্যের পারদে ভালোবাসা সবসময় লুকিয়ে রাখার কারণে আমরা বেশিরভাগই বাবাকে ছোটবেলায় কেবল ভয়ই পেয়েছি। গম্ভীর হোক কিংবা রাগি, ভয় পাই কিংবা কাঁধে চড়ি; সব বাবারাই আমাদের সুপারম্যান বাবা।

আপনার বাবাতো আপনার কাছে সুপারম্যান। কিন্তু আপনি আপনার সন্তানের কাছে সুপারম্যান হতে পারবেন তো? পারবেন! কারণ আজকের পোস্টটি আপনার জন্যই। আপনি চাইলে গম্ভীর, রাগী বাবাও হতে পারেন কিংবা হতে পারেন বন্ধু বাবাও। তবে আমি আমার সন্তানের কাছে বন্ধু বাবা হতে চাই। এই ব্লগটি সুপারম্যান বাবা হতে চাওয়া পৃথিবীর সকল বাবাদের জন্য।

আগে ভালো স্বামী হোন

আপনি আপনার সন্তানের সুপারহিরো। আপনি আপনার সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম প্রেরণাও বটে। আপনি নিজেকে যতটা দায়িত্বশীল ভাবে উপস্থাপন করবেন, আপনার সন্তানও ততটা দায়িত্বশীল হয়ে গড়ে উঠবে। ভালো বাবা হওয়ার পূর্বশর্তই হলো ভালো স্বামী হওয়া। গর্ভকালীন সময়ে স্ত্রীর সঠিক যত্ন নেয়ার মাধ্যমেই কিন্তু আপনার জার্নি শুরু হয়। শুধু যে গর্ভকালীন সময়ে স্ত্রী যত্ন নিবেন বিষয়টা এমন না। বরং ঘরে স্ত্রীর সাথে আপনার সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বাচ্চা লালন পালনের প্রতিটা ক্ষেত্রকে শুধুমাত্র মায়ের কাজ ভাবা যাবে না। সেখানে আপনার সমান অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখবেন, সন্তান যেমন আপনাদের, সন্তানের সাফল্য যেমন আপনাদের তেমনি সন্তানের ডায়াপার চেঞ্জ করার দায়িত্বও কিন্তু আপনাদেরই।

সন্তানের জন্য সময়

অফিসে কয়টা প্রমোশন হলো, নতুন ব্যবসায় কেমন সফলতা আসলো; আপনার এইসব সফলতা হয়তো এক সময় আপনার সন্তানকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। তবে সন্তানের বেড়ে উঠার দিনগুলোতে সন্তান আপনার কাছে অবশ্যই এইসব চাইবে না। সে আপনার কাছে চাইবে সময়। ক্যারিয়ার কিংবা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ততো থাকবেনই। সেই ব্যস্ততা থেকেই যেকোন মূল্যে সন্তানের জন্য সময় বের করতে হবে। প্রতিদিন সন্তানের সাথে গল্প করতে হবে। তার সাথে সিনেমা দেখতে যেতে হবে। সময় করে একদিন বেড়াতে যেতে হবে। পারিবারিক সময়কে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। ছোট ছোট করে উপভোগ করুন না। ধুম করে বৃষ্টি নামলে ভিজতে চলে যান সন্তানের সাথে কিংবা একদিন বিকেল বেলা নেমে পড়ুন ফুটবল না ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে।

সন্তানের সাফল্যের সঙ্গী হোন

আমরা স্বভাবতই চাই আমাদের জীবনের বিশেষ দিন গুলোতে আমাদের কাছের মানুষেরা আমাদের পাশে থাকুক। আর একজন সন্তানের কাছে বাবা-মা ছাড়া কাছের মানুষ কে হতে পারে! আপনার সন্তানের প্রথম স্কুলে যাবার দিন, এসএসসি কিংবা এইচএসএসি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর দিন সন্তানের পাশে আপনিও থাকতে পারেন। স্কুলের প্রথম দিন সন্তানের সাথে আপনিও প্রস্তুত হলেন, তার হাত ধরেই স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসলেন। এতে তার নার্ভাসনেসটা কাটবে। সন্তানের বিশেষ অর্জনগুলোর দিনও নিজে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করুন। যত ব্যস্ততাই থাকুক স্কুলের বার্ষিক সম্মেলন, সন্তানের বিতর্ক প্রতিযোগীতা ইত্যাদিতে নিজে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করুন। নাচ, গান, খেলাধুলা যেকোন পারফর্মেন্স দর্শক সারিতে বসে দেখার চেষ্টা করুন।

লাইফ লেসন সরাসরি আপনার কাছ থেকেই শিখুক

স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ না শুধু, বয়সের সাথে সাথে জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সন্তান আপনার কাছ থেকেই শিখুক। দাঁত ব্রাশ করা, বয়ঃসন্ধিকাল জনিত শিক্ষা, যৌন শিক্ষা কিংবা সিগারেট না খাওয়ার শিক্ষাটাও সন্তানকে আপনিই দিন না। এতে এইসব তার কাছে অস্বাভাবিক না হয়ে খুবই স্বাভাবিক ও সহজ বিষয় হয়ে যাবে। সন্তানের বন্ধু হওয়ার জন্য এরচেয়ে ভালো অপশন খুব একটা নাই। সন্তান বড় হলে তাকে শেভিং রেজার আর ক্রিম কিনে দিন আপনিই। প্রয়োজনে শিখিয়ে দিন কীভাবে শেভ করতে হয়। কন্যা সন্তানকে স্যানেটারি প্যাড কিনে দিতেই পারেন। তাছাড়া নৈতিকতা, মানবিকতা ও ইত্যাদিতো শেখাবেনই।

সন্তানের ভরসার জায়গা হোন

আপনি আপনার সন্তানের কাছে ততটুকু বন্ধু হতে পারবেন সে যতটুকু আপনার উপর ভরসা করতে পারবে। সন্তান তার সকল ভুল, ঠিক কিংবা খুবই অপ্রয়োজনীয় কোন ইচ্ছা আপনার কাছে প্রকাশ করতে কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সেটা নিশ্চিত করুন। এজন্য দরকার সন্তানকে সময় দেয়া ও তার সাথে আলোচনা করা। আপনার আলোচনা যত বন্ধুসুলব হবে ও সেখানে তার সরাসরি অংশগ্রহন, তার মতের প্রাধান্য, শিক্ষণীয় সমালোচনা যত বেশি থাকবে সন্তান ততবেশি আপনার উপর ভরসা করতে পারবে। মনে রাখবেন, আপনি সন্তানকে যত বেশি ধমক দিবেন, যত বেশি কড়া শাসনে রাখবেন সন্তানের সাথে আপনার দূরত্বটা যত বেশিই বাড়তে থাকবে।

সন্তানের চাওয়াকে গুরুত্ব দিন

একটু বড় হয়ে চুল নিয়ে কিংবা জামা কাপড় নিয়ে স্টাইলিশ হওয়ার সাধ জাগে সব কিশোর কিশোরীদের মনে। তেমন কিছু না, একটু চুল বড় রাখতে চাওয়া, চুল নিয়ে নানা রকম স্টাইল করতে চাওয়া কিংবা বড়জোর একটা স্টাইলিশ জিন্স প্যান্ট পরা। এই সময়ে একটা সমস্যা প্রায়ই হয়। বাবা-মা-রা মনে করেন চুল বড় রাখাটা কিংবা মেয়েদের একটু অ্যারোগেন্ট হওয়া মানে বখে যাওয়া। চুল বড় রাখার কথা বললে একটু ধমক টমক দেন। ফলে সন্তানের মাঝে শুরুতেই নিজের চাওয়া পাওয়ার মাঝে হতাশাটা ঢুকে পড়ে। নিজের কোন ইচ্ছার কথা বলার আগে তার মনে একটা ভয় ঢুকে যায়। এখান থেকেই হয়তো সন্তানের সাথে আপনার দূরত্বটাও তৈরি হয়ে যায়। একটু চুল বড় রাখুক না যদি সে চায়! আপনি তার ঢাল হয়ে যান।  কিংবা বন্ধুদের সাথে কোথাও ঘুরতে যেতে চায়! আম্মু দিবে না! আম্মুর কাছ থেকে অনুমতিটা আপনিই নিয়ে দিন না। আম্মু যেমন ট্যূরের জন্য আপনার কাছ থেকে সন্তানের জন্য কিছু বাড়তি টাকা ব্যবস্থা করে দেয় তেমন করে!

এই যে এইসব ছোট খাটো খুনসুটিগুলোই কিন্তু আপনাদের পরিবারে একটা দারুণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলবে। কেউ কাউকে ভয় পাবে না। নির্দ্বিধায় নিজের চাওয়ার কথা আপনার কাছে বলতে পারলেই না সে আপনাকে সুপারহিরোর আসনটা আরো জোরালোভাবে দিবে।

আপনার সন্তানের সৃজনশীলতা বিকাশে তাকে বিজ্ঞানবাক্স দিন। অনলাইনে বিজ্ঞানবাক্স অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন।

69 total views, 2 views today

What People Are Saying

Facebook Comment