Show Categories

বিজয় দিবস উপলক্ষে কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরগাঁথা!

বিজয় দিবস

তোমরা যখন এই লেখাটা পড়ছো, তখন বেশিরভাগ স্কুলেই ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। সবার মধ্যে একটা ছুটির আমেজ। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ বেড়াতে যাবে, কেউ কেউ ম্যাথ অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করবে, কেউ বা গল্পের বই পড়ে সময় কাটাবে। সামনেই বিজয় দিবস, এটা নিয়েও নিশ্চয়ই অনেক অনেক পরিকল্পনা আছে তোমাদের? সময়টা সুন্দর, সময়টা আনন্দের, তাই না? এই যে আমরা একটা স্বাধীন দেশে বসবাস করছি, মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নিচ্ছি এর বিনিময়ে আমাদের বিসর্জন দিয়ে হয়েছে অনেক তাজা প্রাণ। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। তোমরা কি জানো, মুক্তিযুদ্ধে কিশোররাও অংশগ্রহণ করেছিলো? আজ এমন কজন অকুতোভয় কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কথাই তোমাদের জানাবো।

আবু সালেক
১৯৭১ সালে আবু সালেক ছিলেন সপ্তম শ্রেণীর দুরন্ত এক কিশোর। যুদ্ধ শুরু হবার পর তার এলাকা ব্রাহ্মনবাড়িয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়। কারণ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাথে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলো ভালো, এছাড়া ছিলো বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার প্রায় ১০ লাখ লোক মুক্তিযুদ্ধের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিশোর আবু সালেককেও স্পর্শ করলো এই আগুনের আঁচ। প্রশিক্ষণ নিতে নিতে পালিয়ে গেলেন ভারতে। প্রশিক্ষণ নিলেন যুদ্ধের জন্যে নিজেকে তৈরি করতে। যখন ফিরে এলেন, যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্যে, তাকে কেউ তেমনভাবে আমলে নেয় নি। এত ছোট ছেলে কীভাবে যুদ্ধ করবে! কিন্তু আবু সালেক তা মানতে পারেন নি। ভীষণরকম জেদ ধরেন, যুদ্ধ করবেনই! অবশেষে তাকে নেয়া হলো ৪ নং বেঙ্গেল রেজিমেন্টের একটা দলে নেয়া হয়। শুরু হয় তার সৈনিক জীবন। বেশ কটি সম্মুখযুদ্ধে তিনি সাহসের সাথে অংশ নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে বয়সে ছোট হলেও সাহসে সে কারো থেকে কম না! এর মধ্যে একদিন সে এক বিশাল সাহসের কাজ করে ফেললো! পাকবাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ চলছিলো সেদিন চন্দ্রপুর গ্রামে। মুক্তিবাহিনী অবস্থা নিয়েছে বাংকারে। এদিকে পাকবাহিনী আছে সুবিধাজনক অবস্থায়। কোনঠাসা করে ফেলেছে মুক্তিবাহিনীকে। পিছু হটা ছাড়া উপায় নেই। সেই সময় বাংকার সুরক্ষিত রেখে অনবরত গুলি করে সবাইকে বাঁচিয়ে দিলেন কে, বলো তো? হ্যাঁ, কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক! পাক হানাদার বাহিনী সেদিন একদম বোকা বনে গিয়েছিলো। ভেবেছিলো যে মুক্তিবাহিনী খুব সংগঠিত হয়ে তুমুল আক্রমণ চালাচ্ছে। অথচ সেদিন পুরো বাংকার সামলিয়েছিলেন আবু সালেক একাই! ভাবতে পারো, কতটা বীরত্বের কাজ এটি! এই বীরত্বের প্রতিদানও অবশ্য তিনি পেয়েছেন। তাকে দেয়া হয় বীর প্রতীক উপাধি।

আরও পড়তে পার – চাঁদের সাতকাহন 

বাহাউদ্দিন রেজা
বাহাউদ্দিন রেজা ছিলেন নবম শ্রেণীর ছাত্র। তাকে অবশ্য আবু সালেকের মত যুদ্ধে যোগ দিতে খুব একটু ঝক্কি পোহাতে হয় নি! কারণ, সম্মুখযুদ্ধে যোগ দেবার আগে তিনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানা থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে এনেছিলেন! কী সাহস, ভেবে দেখো! অস্ত্র ছিনিয়ে আনার পর তিনি প্রশিক্ষন নেন কাঁঠালিয়া ক্যাম্প থেকে। প্রস্তুত করেন দেশকে শত্রুমুক্ত করার কাজে। প্রশিক্ষণে নিযের যোগ্যতা প্রমাণ করে আটজনের একটি দলের গ্রুপ কমান্ডার নির্বাচিত হলেন তিনি। কমান্ডারকে তো শুধু গুলি ছুড়লে হবে না, যুদ্ধের পরিকল্পনাও করতে হবে! তিনি পরিকল্পনা করলেন কমার্স ব্যাংকে গেরিলা আক্রমণ চালাবেন। সেখানে যেতে হবে নৌকায় করে। চারটি দলে ভাগ হয়ে তারা রওনা দিলেন। সাথে অস্ত্র হিসেবে নিলেন পিস্তল আর গ্রেনেড। তবে সবকিছু পরিকল্পনা মত হলো না। বাহাউদ্দিন গ্রেনেড ছুড়লেন ঠিকই, কিন্তু সেটার স্প্লিন্টার তার গায়ে এসে বিঁধলো। রক্তাক্ত শরীর নিয়েই তিনি ছুটলেন। নদীর কাছে পৌঁছুতে হবে। খেয়াপাড়ি দিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছুতে হবে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ! পথে দেখা হয়ে গেলো এক রাজাকারের সাথে। রাজাকারটি তাকে চোখে চোখে রাখছে। সুযোগ পেলেই ধরিয়ে দেবে পাক মিলিটারীর কাছে। এক পর্যায়ে খপ করে তার কলার ধরে ফেললো! সেই অবস্থাতে বাহাউদ্দিন কী করলো, জানো? এক লাথিতে রাজাকারটিকে ফেলে দিলো। এরপর পিস্তল দিয়ে গুলি করে তার জীবনের অবসান ঘটালো। এরপর এক ছুট! খেয়াঘাটে পৌঁছুনোর আগে কোনো থামাথামি নেই!বাহাউদ্দিন পরবর্তীতে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হন।

সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক লালু
এবার শোনো আমাদের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক লালুর কথা। তার ভালো নাম শহীদুল ইসলাম।  মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিলো ১৩ বছর। লালু ছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। প্রথমদিকে তিনি এবং তার পরিবার পাক হানাদার বাহিনীর প্রবল আক্রমণে জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নেন কেরামজানী জাওয়াল স্কুল মাঠে। সেখানে মুক্তিযদ্ধাদের ক্যাম্প ছিলো। দুরন্ত সাহসী লালু সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নানা কাজে সাহায্য করতে থাকলেন। হয়ে উঠলেন সবার প্রিয় পাত্র। কিছুদিন ছোটখাট কাজ করার পর লালু জেদ ধরলেন যুদ্ধ করবেন বলে। মুক্তিবাহিনীর সেই দলের কমান্ডার আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী তো একরত্তি ছেলের আবদার শুনে হেসেই বাঁচেন না! কিন্তু লালু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুদ্ধ করবেনই। অবশেষে তাকে পাঠানো হলো মেঘালয়ে, যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। অল্প কদিনেই লালু স্টেনগান এবং গ্রেনেডের ব্যবহারে পাকা হয়ে উঠলেন। ফিরে এসে পরিচয় দিলেন অসাধারণ বীরত্বের! ৭ই অক্টোবরে গোপালপুরে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয় আমাদের যোদ্ধাদের। কিন্তু কোনভাবেই কর্তৃত্ব আনতে পারছিলেন না, এমন তুমুল লড়াই চলছিলো। সেসময় এক অভিনব বুদ্ধি আঁটা হলো। লালুকে পাঠানো হলো পাক হানাদারদের ক্যাম্পে, ফুট ফরমাশ খাটতে। করিৎকর্মা এবং বুদ্ধিমান লালু খুব সহজেই পাকবাহিনীর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হলেন। এদিকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে রাখা হলো পাক বাহিনীর ক্যাম্প। লালু করলেন কী, ক্যাম্পের ভেতর ঢুকে গ্রেনেড হামলা করে ৮ জন পাকসেনাকে খতম করলেন। অবশেষে আমাদের বীর সেনারা গোপালপুরকে শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হন। লালু এরপরেও আরো বেশ কিছু অপারেশনে অংশ নেন।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শুধুমাত্র এই তিনজন না, আরো অনেক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা অংশ নিয়েছিলেন। তোমাদের এখন একটা কাজ করতে হবে। এই তিনজন ছাড়াও আরো  কিশোর মুক্তিযোদ্ধার নাম এবং তাদের বীরত্বের গল্প জানতে হবে। কী জানলে বন্ধুদের অবশ্যই জানিও। জানাতে পারো আমাদেরও, [email protected] এই মেইল এ্যাড্রেসে।

বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র সায়েন্স কিট অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স আপনার সন্তানের অবসর সময় সুন্দর করবে, এবং তার মেধা বিকাশে সাহায্য করবে। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। 

 

492 total views, 1 views today

What People Are Saying

Facebook Comment