শিশু যৌন নিপীড়ন। এই বিষয়ে লিখতে আমাদের ইচ্ছে করে না। শিশুদের মতো দেবদূত একটা স্বত্বার সাথে যৌন নিপীড়নের মতো একটা নির্মম, নোংরা আর ভয়ংকর শব্দগুচ্ছকে একসাথে লিখতে কারই বা ভালো লাগবে? কিছু দিন আগে শিশুদের যৌন নিপীড়ন নিয়ে এক আপুর সাথে আলোচনা করছিলাম। আপুর একটা কথা এখনো মাথায় গেঁথে আছে। আপু বলেছিলেন, আমি আমার সন্তানের কোমল মনে অবিশ্বাসের আর সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দিতে পারবো না। আমি তাকে বলতে পারবো না, প্রতিদিন যে মানুষগুলোকে দেখছো এদের মাঝেই লুকিয়ে আছে বিকৃত কিছু মানুষ, যে তোমার ক্ষতি করতে চায়। আমি চাই আমার সন্তান তার চারপাশকে, চারপাশের মানুষগুলোকে বিশ্বাস করে আর ভালোবেসে বড় হোক।

যদি আমাদের পৃথিবীতে সবাই মানুষ হয়ে যেতো তাহলে হয়তো আপুর মতো চিন্তা আমরা সবাই করতে চাইতাম। কিন্তু কষ্টের হলেও সত্য আমাদের চারপাশের সবাই মানুষ না। কিছু কিছু অমানুষও আছে। সেই অমানুষদের হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করার জন্য আমাদেরকে একটু সাবধান থাকতেই হবে। যথাসম্ভব কোমল ও সুন্দর করে সাবধান করতে হবে আমাদের সন্তানদেরও।

আগের পোস্টে আমরা শিশুদেরকে যৌন নিপীড়ন থেকে রক্ষা করার বেশ কিছু টিপস নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আজকে আমরা আলোচনা করবো শিশুদের যৌন নিপীড়ন নিয়ে প্রচলিত থাকা বেশ কিছু মিথ নিয়ে।

মিথ ১-ছেলে শিশুরা নিপীড়নের শিকার হয় না

যৌন নিপীড়ন শব্দটা শুনলেই আমাদের মাথায় সবার আগে কিন্তু মেয়েদের কথাই আসে। আমরা ধরেই নেই যে কেবল মেয়ে শিশুরাই নিপীড়নের শিকার হতে পারে। ছেলেদের উপর এই কালো ছায়াটা পড়ে না। কিন্তু আমাদের পাশের দেশ ভারতের একটা গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ৫৩ শতাংশ ছেলে শিশুরা কোন না কোনভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। সত্য কথা বলতে একজন নিপীড়কের মানসিকতা এতটাই বিকৃত থাকে যে, তার কাছে ছেলে বা মেয়ে কোন তফাৎ তৈরি করে না। সে সুযোগ খোঁজে সবসময়। তাছাড়া শিশুদের সাথে যে এমন বিকৃত একটা কাজ করতে পারে তার কাছে লিঙ্গ তফাৎ থাকার কথাও না। সুতরাং আপনার মেয়ে শিশুর পাশাপাশি ছেলে শিশুকেও অবশ্যই নিপীড়ন সম্পর্কে সচেতন করবেন।

মিথ ২-আমার সন্তান পরিবার ও পারিবারিক পরিচিতদের বাইরে যায় না। সে নিরাপদ।

আপনাকে একটা ভয়ানক তথ্য দিতে পারি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিউটের সাইকিয়াট্রিক ডাঃ হেলাল উদ্দিন আহমেদের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, আমাদের দেশের যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুদের ৭৫ শতাংশই হয় পারিবারিক ঘনিষ্ঠজন দ্বারা। নিপীড়ক যে কেউ হতে পারে। সাধারণত এই ধরণের লোককে বাইরে থেকে তেমন কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু সুযোগ পেলেই এরা শিশুদের উপর এদের বিকৃত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। পারিবারিক পরিচিত, বাসার ড্রাইভার, গৃহ পরিচায়িকা কিংবা আপনার কোন রুচিশীল আধুনিক বন্ধুও নিপীড়ক হতে পারে। পরিচিত মানুষদের প্রতি সন্তানের আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন। কোন আচরণ আপনার কাছে অস্বাভাবিক মনে হলে সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন।

মিথ ৩- শুধুমাত্র পুরুষরাই নিপীড়ক হয়ে থাকে

এটা আরো একটি ভুল ধারণা। নিপীড়ক নারী পুরুষ যে কেউ হতে পারে। আরো পরিষ্কার করে বললে, মেয়ে শিশুরা নারী দ্বারা ও ছেলে শিশুরা পুরুষ দ্বারাও আক্রান্ত হতে পারে। হতে পারে এর ঠিক বিপরীতটাও। মনে রাখবেন, নারী, পুরুষ, সাদা, কালো, ধনী, গরিব, শিক্ষিত, অশিক্ষিত যে কারোর ভেতরই লুকিয়ে থাকতে পারে একজন নিপীড়ক।

মিথ ৪-শুধু মাত্র নিম্নবিত্ত সমাজে শিশুরা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়

নিন্মবিত্ত, উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত ইত্যাদি সামাজিক অবস্থার সাথে যৌন নিপীড়নের কোন সম্পর্ক নাই। একজন নিপীড়ক যে কোথাও থাকতে পারে। নোংরা বস্তিতে যেমন থাকতে পারে তেমনি থাকতে পারে বিলাস বহুল ভবনে সুন্দর ডেকোরেশন করা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমেও। হ্যাঁ, উচ্চবিত্ত, আধুনিক, স্মার্ট যে কোন সমাজেই বসবাস করতে পারে একজন নিপীড়ক।

মিথ ৫-শিশুরা নিজেরাই নিপীড়ন বুঝতে পারে

একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুরা যৌনতা সম্পর্কেই তেমন কিছু জানে না। সেখানে নিপীড়ন সম্পর্কে কীভাবে জানবে? আরেকটা মজার বিষয় হলো আমরা যৌনতাকে ট্যাবু করে কখনোই শিশুদের সাথে যৌনতা নিয়ে সরাসরি কথা বলি না। ফলে শিশুরা জানেও দেরিতে, তাও অন্য কারোর মাধ্যমে ও ভুল ভাবে। ফলে তারা যদি কারো কাছ থেকে নিপীড়নের শিকার হয় তা আপনাকে বলতেও পারে না। ফলে আপনি সাবধান হতে পারেন না। ঘটে যেতে পারে বড় কোন দুর্ঘটনা।

মিথ ৬-শিশুদের সাথে যৌন নিপীড়ন নিয়ে আলোচনা করলে তারা ভয় পাবে

হ্যাঁ। এই টপিকটা আপনাকে কিছুটা ভাবাতে পারে। কেন ভাবাতে পারে সেটাও বলি। শত শত বছর ধরে আমরা যৌনতা নিয়ে আমাদের সন্তানদের সাথে কথা বলাকে অস্বাভাবিকভাবে দেখে আসছি। যার ফলে যৌনতা ও এর সাথে সম্পর্কিত যেকোন কিছুকেই আমরা অস্বাভাবিক ভেবে বসে থাকি। কিন্তু যদি আমরা সন্তানের সাথে যৌনতা নিয়ে আলোচনা করতাম, সন্তান যদি যৌন শিক্ষাটা আমাদের কাছ থেকেই পেতো তাহলে এই ধারণার জন্ম নিতো না। প্রতিদিনই আমাদের সাথে ছোট খাটো দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়, সেগুলোর জন্য আমরা সাবধানও থাকি। সাবধান করি সন্তানদেরও। অপহরণ, ছেলে ধরা, রাস্তায় সাবধানে হাঁটা, চুরি, ছিনতাই ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য দুর্ঘটনার মতো যৌন নিপীড়নকেও একটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা হিসেবে সন্তানের সামনে উপস্থাপন করুন। এতে বিষয়টা তার কাছেও স্বাভাবিক হবে। আর যৌনতা তার কাছে স্বাভাবিক হলেই সে আপনার সাথে সবকিছু নিঃসংকোচে শেয়ার করবে।

যৌন নিপীড়ন সন্তানের সাথে ঘটে যাওয়া একটা কুৎসিত ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এটা ঘটে নিরবে। অনেকে শিশুদের নানা ভাবে ভয় দেখায়, যেন শিশুরা বিষয়টা বাবা-মাকে না জানায়। শিশুরা বিষয়টা সম্পর্কে তেমন জানে না বলে বাবা-মাকেও জানাতে পারে না। সে নিজেও একটা ভয়, আতঙ্ক আর দোলাচলে থাকে। আর কড়া শাসনে রাখলেতো স্বাভাবিক বিষয়ই শিশুরা বাবা-মাকে জানাতে ভয় পায়। সেজন্য এই কুৎসিত কাজটি থেকে সন্তানকে রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে ভালো অপশন আলোচনা। যত বেশি সন্তানের সাথে আলোচনা করবেন বিষয়টা তার কাছে তত স্বাভাবিক হবে। ফলে আপনার সন্তানের সাথে এমন কিছু ঘটলে সবার আগে আপনাকেই তা বলবে।

830 total views, 1 views today

What People Are Saying

Facebook Comment