Show Categories

সন্তানের সামনে বাবা মায়ের ঝগড়া; ক্ষতিটা ঠিক কত বড়?

বাবা মায়ের ঝগড়া

[emaillocker]

বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ নাকি সন্তানের সামনে বাবা মায়ের ঝগড়া; কোনটা সন্তানের বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর? বেশিরভাগ মানুষই বলবে, বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ! কিন্তু বিবিসির একটি গবেষণা বলছে, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের চেয়ে সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের ঝগড়া অনেক বেশি ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে আরো একটি আতঙ্কের তথ্য দেয়া যেতে পারে। ব্রিটেনের বেশ কিছু পরিবারের উপর চালানো একটি গবেষণা বলছে, ৬ মাস বয়সী শিশুর উপরও বাবা-মায়ের ঝগড়ার প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণা ছাড়াও আপনি যদি স্বাভাবিক ভাবেও চিন্তা করেন, দেখবেন সন্তানের বেড়ে উঠার সময় তার চারপাশের পরিবেশ ও ঘটনাপ্রবাহই তার উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।

একটি শিশুর জন্ম থেকে কৈশোর পর্যন্ত তার আশেপাশের এই সব ঘটনাপ্রবাহ ও তার অভিজ্ঞতাই বড় হওয়ার পর তার মানসিক কাঠামোটা তৈরি করে দেয়। ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তার জগত কিংবা বোধেও থাকে তার শৈশব, কৈশোরের শিক্ষার প্রতিফলন।

এখন একজন শিশুর শৈশব, কৈশোর যদি বাবা মায়ের ঝগড়া দেখতে দেখতে কাটে তার প্রভাবই তার পুরো জীবনে পড়বে। চলুন আমরা আজকে জেনে নিবো সন্তানের সামনে বাবা মায়ের ঝগড়া’র প্রতিফলন হিসেবে শিশুর জীবনে কী কী প্রভাব পড়বে।

নেতিবাচক আচরণ শেখা

ঝগড়ার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের নিজেদের উপর খুব একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে যায় অনেক অগ্রহণযোগ্য বিষয়। মুখ থেকে হুট করেই বের হয়ে যেতে পারে কোন কুরুচিপূর্ণ, আক্রমণাত্মক শব্দ। ভাঙচুর কিংবা মারামারি ইত্যাদিও হয়ে যেতে পারে। এই কাজগুলো যখন একটি শিশুর সামনে নিয়মিত ঘটবে জীবন সম্পর্কে তার ধারণাও তেমনই হবে। আপনার মুখ থেকে বের হওয়া কুরুচিপূর্ণ শব্দটিই সে শিখবে। সে ধরে নিবে কারোর সাথে মতের মিল না হলে কুরুচিপূর্ণ শব্দের ব্যবহার, মারামারি, ভাঙচুর খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে

একটি শিশুর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান হলো ঘর। আরো পরিষ্কার করে বললে, শিশুর জগতের পুরোটা জুড়ে থাকে বাবা-মা। সে যখন সেই ঘরেই বাবা-মায়ের মাঝে প্রতিদিন অশান্তি, ঝগড়া দেখে তখন সে সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গাকে সবচেয়ে অরক্ষিত জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে। কথায় কথায় বাবা-মায়ের ছেড়ে যাওয়ার হুমকি তাকে ফেলে দেয় এক গভীর অনিশ্চয়তায়, নিরাপত্তাহীনতায়।

মানসিক ও শারীরিক বিকাশে প্রভাব

বাবা-মায়ের ঝগড়ার মধ্যে বড় হওয়া শিশুরা মানসিকভাবে বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। প্রথমত নিরাপত্তাহীনতায় সে ভোগেই। একই সাথে নিজের কথাগুলো বলার জন্য ভরসা করার মতো কাউকে সে পায় না। ফলে তার মধ্যে হতাশা, একাকিত্ব, বিষণ্ণতা, নিদ্রাহীনতা ও হীনমন্যতা জন্ম নেয়। দীর্ঘদিন এইসব মানসিক জটিলতায় ভোগার কারণে শিশু বড় হলেও মানসিক সমস্যাগুলো তার পিছু ছাড়ে না। এই মানসিক সমস্যাগুলোই তার ভেতরে ধীরে ধীরে বেশ কিছু শারীরিক সমস্যার জন্ম দেয়। এমন অশান্ত পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে শিশুদের মাঝে ডায়বেটিস, হার্টের সমস্যা, হাঁপানি, পুষ্টিহীনতা সহ বেশ কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।

সম্পর্কে অশ্রদ্ধা ও আস্থাহীনতা

বাবা-মার দুজনের মাঝে অবিশ্বাস, ঘৃণা, আস্থাহীনতা, সম্মানহীনতা দেখতে দেখতে বড় হওয়া শিশুরা পরবর্তী জীবনে সব ধরণের সম্পর্কে আস্থাহীনতায় ভোগে।  সহজে কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। মানুষের প্রতি অবিশ্বাস বাড়ে। এই প্রভাবটি পড়তে পারে সন্তানের দাম্পত্য জীবনেও। বাবা-মায়ের সম্পর্কের পুনরাবৃত্তি ঘটে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। ভাবুনতো একটা বার, আপনাদের সাংসারিক জীবনের অশান্তি আপনার সন্তানের পুরো জীবনটাকে একটা অশান্তির চক্রে ফেলে দিয়েছে!

বাবা-মায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা

ঝগড়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ঘটনা প্রায় সবক্ষেত্রেই ঘটে। বাবা-মায়ের ঝগড়ার পর মা সন্তানকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করা কিংবা সন্তানের কোন ভুলের ক্ষেত্রে বাবার উদাহরণ টেনে এনে বলা, তুমি তোমার বাবার মতই বদমাশ হচ্ছো; ইত্যাদি বিষয়গুলো দিনশেষে কিন্তু আপনার সন্তানের মাঝে তার বাবা সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণাকেই পাকাপোক্ত করে। সে বাবাকে খারাপ মানুষ ভাবতে শুরু করে। একই ঘটনা ঘটে মায়ের ক্ষেত্রেও। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানকে নিজের পক্ষে রাখার জন্য বাবা বা মা সন্তানের মাঝে বাবা বা মা সম্পর্কে ইচ্ছাকৃতভাবেই একটা খারাপ ধারণা ঢুকিয়ে দেয়, খারাপ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। ফলে বাবা-মা দু-জনের প্রতিই সন্তানের শ্রদ্ধাও হারিয়ে যায়। একটা বার ভাবুন, সন্তানের কাছে বাবা-মা মানেই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ। সেই ভালো মানুষগুলো যখন একে অন্যকে দোষী, খারাপ বানানোর চেষ্টায় নামবে সেটা সন্তানের জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে!

মাসকাসক্তি ও অপরাধ প্রবণতা

বাবা মায়ের ঝগড়া ও পারিবারিক অশান্তির মাঝে শৈশব, কৈশোর কাটানো শিশুদের মাদকে আসক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। যথেষ্ট মনোযোগ না পাওয়াতে সন্তানতো এমনিতেই হতাশা কাটানোর জন্য কিছু একটা খোঁজেই, তার উপরে বাবা-মায়ের মনোযোগ না থাকলে সে পথটা তার জন্য সহজও হয়ে যায়। একই সাথে তাদের মাঝে আক্রমণাত্মক মানসিকতাও তৈরি হয়। নিয়মিত বাবা-মায়ের ঝগড়া দেখে সে ধারণা করে নেয় সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় আক্রমণ করা। সে অন্যদের সাথে নিজের সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে একই পথ বেছে নেয়। যা পরবর্তীতে তাকে অপরাধের সাথে জড়িয়ে যেতে প্ররোচনা দেয়।

সন্তানকে এই সমস্যা থেকে রক্ষা করার জন্য কী করবেন?

একই সাথে থাকতে গেলে মতের অমিল হতেই পারে। এই মতের অমিল থেকেই সাধারণত ঝগড়ার উৎপত্তি। এই ঝগড়াই শেষ পর্যন্ত মোড় নেয় পারিবারিক কলহ ও অশান্তির দিকে।  নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে ঝগড়া করার ক্ষেত্রে আমরা হয়তো পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে খুব একটা আমলে নেই না। যার প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর। এক্ষেত্রে সন্তানকে মুক্ত রাখার জন্য, সন্তানের শৈশবকে সুন্দর রাখার জন্য বাবা-মার করণীয়গুলো জেনে নিন

  • সন্তানের সামনে ঝগড়া, একদম না।
  • ঝগড়া বা কলহ না করে সমাধানের চেষ্টা করুন।
  • ঝগড়ার সময় আপত্তিকর, আক্রমণাত্মক, কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • বাড়িতে কোন ধরণের আতঙ্কিত পরিবেশ তৈরি করবেন না। যেমন-ভাঙচুর, শারীরিক আঘাত, জোরে চিৎকার।
  • নিজেদের মাঝে যত খারাপ সম্পর্কই থাকুক সেখানে সন্তানকে যুক্ত করবেন না। সন্তানের কাছে অন্যের দোষ দেয়া, বাবা মায়ের ঝগড়া’র ফলে তৈরি হওয়া ক্ষোভ সন্তানের উপর দিয়ে প্রকাশের চেষ্টা করা। “বাবার পরিবারের মতো বেয়াদব হচ্ছো, মায়ের খারাপ সব কিছু পেয়েছো, রক্তই তো ভালো না-সন্তান ভালো হবে কীভাবে” ইত্যাদি কথা সন্তানকে বলা থেকে বিরত থাকুন। আপনাদের মাঝে সম্পর্কে যাই থাকুক, আপনারা দু-জন যে সন্তানকে সমানভাবে ভালোবাসেন সে ধারণা সন্তানকে দেয়ার চেষ্টা করুন।
  • সন্তানের খারাপ ফলাফল কিংবা কোন বাজে কাজের জন্য একে অন্যকে দোষারোপ করবেন না। যেমন-সারাদিন ঘরে বসে কী করো? ছেলেকে/মেয়েকে ঠিকঠাক পড়াতে পারো না; তোমার লাই পেয়ে বখে গেছে; ইত্যাদি কথা-বার্তা সন্তানের সামনে করা থেকে বিরত থাকুন।

শেষ করি একটা গল্প দিয়ে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেঘলা সরকারের কাছে মৃদুলা নামে একজন রোগী আসেন অদ্ভুত এক সমস্যা নিয়ে। ৩০ বছরের জীবনে উনি কখনো হতাশা, বিষণ্ণতা থেকে মুক্ত হতে পারেননি। মানুষের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন না। সবসময় নিরাপত্তাহীনতা ও  ভোগেন। তার সাথে ঘটা প্রতিটি ঘটনার ইতিবাচক দিকের চেয়ে নেতিবাচক দিকটি তাকে বেশি ভাবায়। ডাক্তার মেঘলা সরকার অনেক খুঁজেও মৃদুলার বর্তমান জীবনে কোন সমস্যা না পেয়ে একটু শৈশবটা ঘেটে দেখতে চাইলেন। এরপর সামনে আসে মৃদুলার শৈশবে বাবা মায়ের ঝগড়া ও তুমুল পারিবারিক কলহের বিষয়টি।

খালি চোখে আমাদের কাছে এই সমস্যাগুলো ধরা পড়ে না। কিন্তু সন্তানকে সমস্যাগুলো বয়ে নিয়ে যেতে হয় সারা জীবন। আমাদের সন্তানদের শৈশব ভালো কাটুক। মুক্ত থাকুক সকল ধরণের কালো ছায়া থেকে। ভালো থাকুন আপনারাও।

বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র সায়েন্স কিট অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স আপনার সন্তানের অবসর সময় সুন্দর করবে, এবং তার মেধা বিকাশে সাহায্য করবে। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

 

[/emaillocker]

254 total views, 1 views today

What People Are Saying

Facebook Comment