স্কুল পরিবর্তন; সন্তানকে সাহায্য করুন মানিয়ে নিতে

স্কুল পরিবর্তন

অনেক সময় চাকরি বা অন্যান্য কারণে আমাদের বসবাসের জায়গা পরিবর্তন করতে হয়। বসবাসের জায়গা পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে যায় অনেক কিছু। চেনা পরিবেশ, এলাকা, বাসা ইত্যাদি সব শুরু করতে হয় নতুন ভাবে। একই সাথে পরিবর্তন হয়ে যায় বাচ্চাদের স্কুলও। আর আপনি যদি সরকারী কর্মকর্তা হন তাহলে এই পরিস্থিতির সাথে আপনি বেশ পরিচিত। আপনি বড় মানুষ, মানিয়ে নেয়া ও বোঝার ক্ষমতা বেশি থাকায় মানিয়ে নিতে পারেন সহজেই। কিন্তু সমস্যাটা হয়ে যায় আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে। আগের চেনা স্কুল, চেনা ক্লাসরুম, চেনা শিক্ষক, চেনা বন্ধু কিংবা চেনা ক্যান্টিন ছেড়ে আসায় একটা খারাপ লাগাতো তার ভেতরে থাকেই। সাথে থাকে নতুন স্কুলের অচেনা সবকিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ। শুধু চাকরির জন্য না, স্বাভাবিক ভাবে ছোট বয়সে সবার অন্তত দুই বার স্কুল পরিবর্তন করতে হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এরপর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ছোট বয়সে এই দুইটি প্রায় আমাদের সবাইকেই করতে হয়। স্কুল পরিবর্তনের পর নতুন স্কুলের সাথে নিজেকে সহজে ও অল্প সময়ে মানিয়ে নিতে না পারলে পড়ালেখায়ও তার প্রভাব পড়ে। স্কুলে যাওয়ার প্রতি অনীহাও দেখা দেয়। সেজন্য যত দ্রুত সম্ভব নতুন স্কুলের মানিয়ে নিতে সন্তানকে সাহায্য করা উচিত।

নতুন স্কুলের সাথে মানিয়ে নেয়ার ৬ টি ধাপ

নতুন স্কুল সম্পর্কে আগেই জেনে নেয়া

কোন কিছু সম্পর্কে কোন ধরণের ধারণা না থাকার চেয়ে অল্প ধারণা থাকলেও সেখানে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া সম্ভব। সেজন্য স্কুল পরিবর্তন করার আগে সন্তানকে নতুন স্কুল সম্পর্কে টুকটাক জানিয়ে রাখুন। স্কুলের নাম, স্কুল কোথায়, বাসা থেকে কত দূর, কীভাবে যেতে হবে, স্কুল ড্রেস কেমন; ইত্যাদি নিয়ে নতুন স্কুলে যাওয়ার কিছু দিন আগে থেকেই তার সাথে কথা বলুন। সব স্কুলেরই নামের পেছনে কোন বিশেষ কারণ থাকে বা স্কুলের বিশেষ কোন গুণ থাকে। সেসব সন্তানকে জানান। স্কুলের কোন ম্যাগাজিন বা দেয়ালিকা থাকলে তা সংগ্রহ করে তাকে পড়তে দিতে পারেন। আগে থেকে জানিয়ে রাখলে, স্কুল নিয়ে গল্প করলে সে মানসিকভাবে কিছুটা আত্মবিশ্বাসী থাকবে। এতে স্কুলের সাথে মানিয়ে নেয়া কিছুটা সহজ হবে।

স্কুল শুরুর আগে একদিন ঘুরে আসুন স্কুল থেকে

নতুন স্কুল শুরু হওয়ার অন্তত ২-৩ দিন আগে নতুন স্কুল থেকে সন্তানকে ঘুরিয়ে আনুন। স্কুলে যাওয়ার পথ, ক্লাসরুম, কমন রুম, ক্যান্টিন, লাইব্রেরী, টিচার্স রুম, ওয়াশরুম ইত্যাদি তাকে ভালোভাবে দেখিয়ে আনুন। এতে সে নতুন স্কুল সম্পর্কে একটা বাস্তব ধারণা পাবে। ফলে ক্লাস শুরুর দিন স্কুল তার একদম অপরিচিত লাগবে না। সম্ভব হলে ক্লাস রুমে ক্লাস চলাকালীন সময়ে নিয়ে যেতে পারেন। ক্লাসরুমের পরিবেশও দেখলো, ক্লাসের কয়েকজনের চেহারাও ওইদিন তার মনে গেঁথে যাবে। ক্লাসে দু একজন সহপাঠিও স্কুল শুরুর আগেই তার চেনা হয়ে যাবে।

শিক্ষকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করুন

শিশুরা মূলত বড়দের উপরই ভরসা করে। যেকোন ধরণের ভয়, চিন্তা, খারাপ লাগা ইত্যাদির ক্ষেত্রে তারা সবার আগে বড়দের কাছে ছুটে আসে। আর স্কুলে আপনি না থাকা অবস্থায় শিক্ষকরাই আপনার সন্তানের অভিভাবক। সন্তান যদি শিক্ষকের উপর ভরসা করতে পারে তাহলে স্কুলের সাথে মানিয়ে নিতে সে অনেকটাই এগিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে যেদিন তাকে স্কুলে নিয়ে যাবেন সেদিন তাকেসহ স্যারদের সাথে একটু গল্প করে আসতে পারেন। শিক্ষকদের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। শ্রেণী শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। আপনার সন্তানের ব্যক্তিত্বের ধরণও শিক্ষকদের জানিয়ে রাখতে পারেন। কোন বিষয়ে সে দূর্বল, কোন বিষয় তার ভালো লাগে, কোন বিষয়ে সে দারুন ভালো ইত্যাদি শিক্ষকদের জানাতে পারেন।

প্রতিদিন স্কুলের গল্প করার চেষ্টা করুন

কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে সে বিষয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। একই সাথে সে বিষয়ের অনেক ভালোদিক কিংবা খারাপ দিকও বের হয়ে আসে। সন্তানের সাথে স্কুল নিয়ে প্রতিদিন গল্প করার চেষ্টা করুন। নতুন ক্লাস কেমন লাগছে, প্রতিদিনের স্কুলের টুকটাক ঘটনা, ক্যান্টিনের খাবার কেমন, সহপাঠিরা কেমন, কোন স্যারকে বেশি ভালো লাগে; ইত্যাদি বিষয়গুলো তার কাছে জানতে চান। আপনি যদি প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে সন্তানের সাথে স্কুল নিয়ে গল্প করেন তাহলে তার মধ্যে নতুন স্কুল নিয়ে সমস্যা বা হতাশা থাকলে তাও জানতে পারবেন ও সমাধান করতে পারবেন।

বন্ধু বানাতে সাহায্য করুন

স্কুল পরিবর্তন করার পর নতুন স্কুলে যত দ্রুত বন্ধু পেয়ে যাবে তত দ্রুত সে স্কুল উপভোগ করতে শুরু করবে। বাড়তে থাকবে স্কুলের প্রতি আগ্রহ। সেজন্য স্কুলে দ্রুত বন্ধু বানাতে তাকে সাহায্য করুন। স্কুলের গল্প করতে গিয়ে সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন ক্লাসে কোন বন্ধুকে তার ভালো লাগে। কার সাথে বসে। কার সাথে বসতে চায়। সেই বন্ধুর বাসা যদি আপনার বাসার কাছাকাছি হয় তাহলে বিকেলে মাঠে খেলার সময়ও দু-জনকে একসাথে খেলতে বলতে পারেন। কিংবা আপনার সন্তানের বন্ধুকে তার বাবা-মা সহ একদিন বিকেলে চা এর দাওয়াত দিতে পারেন।

স্কুলের ক্লাবের সাথে যুক্ত করুন

আপনার সন্তান যদি এক্সট্রোভার্ট হয় তাহলে সে নিজেই স্কুলের বিভিন্ন ক্লাবের সাথে যুক্ত হতে পারবে। আর যদি ইন্ট্রোভার্ট হয় তাহলে তাকে চেষ্টা করুন স্কুলের ক্লাবগুলোর সাথে যুক্ত করতে। এতে সে ক্লাসের বাইরেও বড় একটা প্ল্যাটফর্ম পাবে। স্কুলের ডিবেট ক্লাব, সোস্যাল ক্লাব, স্কাউট, বিএনসিসি ইত্যাদির সাথে যুক্ত থাকলে তার কাছে এক্সট্রা কারিকুলামের অনেক সুযোগ থাকবে। স্কুলের একঘেয়েমি ভাব কাটবে। এবং সহজেই মানিয়ে নিতে পারবে।

স্কুল পরিবর্তন কখনো কখনো পড়ালেখায় বড় প্রভাব রাখে। বিশেষ করে শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে স্কুল পরিবর্তনের শিক্ষার্থীদের উপর নেতিবাচক প্রভাবই বেশি পড়ে। কিন্তু আপনি যদি একটু ভালোভাবে স্কুল পরিবর্তনের বিষটিকে ম্যানেজ করতে পারেন তাহলে এই সমস্যা থেকে উতরে যাওয়া সম্ভব। আপনার সন্তানের ভবিষ্যত সুন্দর হোক।

বিজ্ঞানবাক্স আপনার সন্তানের মেধা বিকাশে দারুন সহায়ক। আপনার সন্তানের জন্য বিজ্ঞানবাক্স কিনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

আরো পড়ুন

সন্তানের স্কুল ভীতি দূর করুন সহজ উপায়ে
পেট ব্যাথা; স্কুল মিস দেয়ার অজুহাত নাকি সত্যি
স্কুলের প্রথম দিন; সন্তানকে প্রস্তুত করবেন কীভাবে
শিশুর হাতের লেখা সুন্দর হোক
সন্তানের একাডেমিক সফলতার টিপস

30 total views, 1 views today

What People Are Saying

Facebook Comment