বাংলাদেশের গ্রামীণ খেলাগুলি আনন্দের অফুরান ভান্ডার।   সুপারির পাতা দিয়ে যে গাড়ি গাড়ি খেলা যায় এ কথা এখনের কোন বাচ্চাকে বললে সে হেসে লুটোপুটি খাবে। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন গ্রামের বাচ্চাদের খেলনা গাড়ির বিকল্প ছিল সুপারি পাতা অথবা বিয়ারিং দিয়ে বানানো ৩ চাকার গাড়ি। বাংলাদেশের রয়েছে অসংখ্য গ্রাম। এসব গ্রামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে হাজারও গ্রামীণ খেলা। টিফিনের সময়, স্কুল ছুটির পরে, কিংবা স্কুল বন্ধের দিনে নাওয়া-খাওয়া ভুলে সারাদিন এই খেলার মধ্যে ডুবে থাকত সব বাচ্চারা। আধুনিকতার এই যুগে এসে খেলার কথা বললে সবার আগে নাম আসবে ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন না হয় মোবাইল, কম্পিউটার/ল্যাপটপের বড় স্ক্রিনে সিওসি, ক্যান্ডি ক্র্যাশ ইত্যাদি গেমের কথা। এসবের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো। আজ আমরা জানব এমন ৫টি গ্রামীণ খেলা সম্পর্কে।

১/ কানামাছি

গ্রামীণ খেলার কথা উঠতেই কানামাছি প্রথম দিকে আসবে। এই খেলায় সবার মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করে তার চোখ বেঁধে দেওয়া হয় যেন সে দেখতে না পারে। এজন্য তাকে কানা বলা হয়। বাকিরা তার চারপাশে মাছির মত তাকে ছুঁতে থাকে। ছোঁয়ার সময় তারা বলতে থাকে –

“কানামাছি ভোঁ ভোঁ

যাকে পাবি তাকে ছোঁ”।

একটু দুষ্টু বন্ধুরা ছোঁয়ার বদলে চিমটি কেটে দিত। চোখ বাঁধা ব্যক্তি যদি এরমধ্যে কেউকে ধরে নাম বলতে পারত তাহলে ধরা পড়া ব্যক্তির চোখ বাঁধা হত এবং একই নিয়মে খেলা চলত ঘন্টার পর ঘন্টা।

২/ বউচি

এই খেলায় দুটি দল থাকবে। দুটি দলেই সমান সংখ্যক খেলোয়াড় থাকবে। এদের মধ্যে প্রতিদলেই একজন করে বউ থাকবে। খেলার সুবিধানুযায়ী বা, ২০-২৫ ফুট দূরত্বে মাটিতে দাগ কেটে দুটি ঘর বানানো হয়। একটি ঘর ছোট আর বাকি ঘরটি বড় হবে। বড় ঘরে বউ বাদে সবাই দাঁড়াবে, এবার কেউ একজন দম ধরে বউকে নিয়ে ঐ ছোট ঘরে রেখে আসবে। অন্য দলের খেলোয়াড়েরা দুই দাগ বা দুই ঘরের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান নিয়ে বউকে পাহারা দিবে, যেন কোন ভাবেই বউ ছোট ঘর থেকে বড় ঘরে আসতে না পারে। কেননা বউ বড় ঘরে আসতে পারলেই ঐ দল জয়ী হবে। ঘরের মধ্যে দাঁড়ানো  খেলোয়াড়দের কাজ হবে দম (চি দেওয়া)ধরে অন্য দলের খেলোয়াড়দের ছুঁয়ে দেওয়া বা, মারা। কেউ একবার মারা গেলে সে ঐ দানের (চলতি খেলায় )জন্য আর খেলতে পারবে না। বিপরীতভাবে কেউ যদি দম ছাড়া দাগের বাইরে আসে তাকে ছুঁয়ে দিতে পারলে সেও মারা যাবে। এর মধ্যে বউ যদি সুযোগ বুঝে বড় ঘরে চলে আসতে পারে তাহলে তারা জয়ী হবে এবং পুনরায় খেলা শুরু হবে। আর যদি বিপক্ষ দলের কেউ বউকে ছুঁয়ে দিতে পারে তাহলে ঐ দলের খেলা শেষ হবে তখন বিপক্ষ দল খেলার সুযোগ পাবে। এভাবে খেলা চলতে থাকে।

৩/ কড়ি খেলা

বৃষ্টির দিনে খেলা বন্ধ থাকবে, তা তো হতে পারে না!  তাই তো এমন দিনে ঘরে বসে শিশু-কিশোররা কড়ি খেলায় মেতে উঠতো। কড়ি হচ্ছে একপ্রকার শামুকের শুকনা খোল। অনেক সময় খেজুরের ২টা বিচিকে ৪ভাগ করে তা দিয়ে চলে কড়ি খেলা। দুটাকে আলাদা আলাদা জোড় বানিয়ে হাতের আঙ্গুলের টোকা দিয়ে লাগাতে পারলে ১ পয়েন্ট হবে। এভাবে যার পয়েন্ট বেশি হবে সে জয়ী হবে। তবে পয়েন্ট গণনা শুরুর আগে তার অবশ্যই একসাথে ৪ বা ১৬ পড়তে হবে। ৪ পড়া মানে হচ্ছে কড়ির ৪টা অংশকে একত্রে ওপর হয়ে পড়তে হবে। আর ১৬ পড়া মানে হচ্ছে ৪টাকে একত্রে চিত হয়ে পড়তে হবে। ১৬ পড়লে যে যতটা গুটি হাতে নিতে পারবে সে তত ৪পয়েন্ট করে পাবে। দুটি গুটি একসাথে জোড়া লেগে পড়লে সেটিতে পয়েন্ট গণনা করা যাবে না। ৩টা গুটি যদি একসাথে চিত হয়ে পড়ে তবে তার ঐ দান বাতিল হবে। তখন অন্যরা সুযোগ পাবে। এভাবে বৃষ্টির তালে পয়েন্ট গুনে হারজিতের খেলা চলতো।

৪/ লুকোচুরি খেলা

নাম দেখেই অনেকটা বোঝা যায় এ খেলা লুকিয়ে লুকিয়ে খেলতে হয়। হ্যাঁ, এ খেলায় একজন চোর থাকবে, যে লুকিয়ে থাকা সবাইকে খুঁজে বের করবে। যাকে সে প্রথম দেখবে সে হবে ১টিপ, এভাবে ২,৩,৪,৫,৬… প্রথম যাকে দেখেছিল সেই হবে পরবর্তী দানে চোর। তবে সবাইকে  খুঁজে বের করার আগে কেউ একজন যদি চোরের মাথা ছুঁয়ে দিতে পারে, তাহলে সে আবার চোর হবে । এই ছুঁয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে তিলক বলে। দিনের বেলা বাদেও চাঁদনী রাতে বাচ্চারা এমন খেলায় মেতে উঠতো।

৫/ মোরগ লড়াই

এটি সাধারণত ছেলেরা খেলে থাকে।  দেশের অনেক স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মোরগ লড়াই এর আয়োজন করা হয়। এই খেলায় কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ জন মিলে খেলতে হয়, তবে বেশিও হতে পারে। খেলার নিয়ম হল প্রত্যেকে এক পায়ে দাঁড়িয়ে এক হাতে পা ধরবে, অন্য হাত দিয়ে পা ধরা হাতের কনুয়ের উপরে ধরবে। এবার একপায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে একে অন্যকে ধাক্কা দিবে। যার পা মাটিতে পড়ে যাবে সে বাদ যাবে। এভাবে খেলতে খেলতে সর্বশেষ যে টিকে থাকবে সে হবে প্রথম।

আরো পড়তে পারেন- মজার বিজ্ঞান- পানিচক্র

277 total views, 1 views today

What People Are Saying

Facebook Comment