Show Categories

পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার; যে রোগের কারণে মা’ও সন্তানের ক্ষতি করতে চান

Parent Bigganbaksho

পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার কী
অনেক সাধনা, স্বপ্ন ও অপেক্ষার পর সন্তান জন্মদান কিংবা কোল জুড়ে নবজাতক আসা অনেক আকাঙ্ক্ষিত ও বর্ণনাতীত খুশির ও ভালো লাগার মুহূর্ত। সন্তান জন্মদানের পর থেকেই সদ্য মা হওয়া অনেকের মাঝে মানসিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। এমনও হতে পারে, একজন মা সন্তানের প্রতি টান কিংবা কাঙ্খিত বন্ধন অনুভব করছেন না। মায়েরা নিজেদের অনুভূতিতে, চিন্তায় হতাশা ও বিষণ্ণতা অনুভব করে থাকেন। কখনো কখনো তাদের আচরণে সেটা স্পষ্ট হয়। অনেকের মাঝে হতাশা থেকে সন্তান ও নিজের ক্ষতি করার মতো চিন্তাও চলে আসে। সহজ কথায় এটাই হলো পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার। এটাকে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনও বলা হয়। পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার সাধারণত শিশু জন্মের পর থেকে শুরু হয়ে ২-৩ সপ্তাহ থাকে। কিন্তু অনেকে ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জটিলতার মধ্য দিয়ে যায়। সেজন্য পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডারের কোন জটিলতা অনুভব হলে সেটা লুকিয়ে না রেখে সবার সাথে শেয়ার করা উচিত ও যথাযথ চিকিৎসা নেয়া উচিত।

পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার কেন হয়?
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের জন্য গবেষকরা দু-ধরণের কারণকে দায়ী করে থাকেন। প্রথম কারণটি হরমোনজনিত আর দ্বিতীয় কারণটি সম্পূর্ণ মানসিক। সন্তান জন্মদানের আগে ও পরে বিভিন্ন জটিলতার কারণে মায়েদের মনে চাপ পড়া ও অতিরিক্ত মানসিক টানাপোড়নের কারণেও পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার হয়ে থাকে।

হরমোনজনিত কারণ
সন্তান জন্মদানের সময় প্রচুর পরিমাণে এস্ট্রোজেন ও প্রো-এস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণের ফলে পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার হতে পারে। তাছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থি দ্বারা উৎপাদিত হরমোনের দ্রুত নিঃসরণের ফলেও পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন হতে পারে।

মানসিক সমস্যাজনিত কারণ
সন্তান জন্মদান, জন্মদানের আগে ও পরে মায়েরা বিভিন্নভাবে পারিবারিক কিংবা সামাজিক জটিল কোন পরিস্থিতি কিংবা মানসিক কোন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন। সে কারণে পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার হতে পারে। চলুন জেনে নিই কোন কোন বিষয়গুলো একজন মাকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে।
• গর্বধারণ ও প্রসবের সময় পারিবারিক কোন টানাপোড়েন থাকা কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক কোন সহায়তা না পাওয়া।
• প্রসবের পর ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত ও বিশ্রামহীনতায় ভোগা।
• পারিবারিক ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা।
• দাম্পত্য কলহ বা স্বামীর সাথে সম্পর্কের তিক্ততা।
• গর্ভধারণের আগে বা গর্ভকালীন ডায়বেটিস থাকলে।
• অপরিকল্পিত গর্ভধারণ।
• নবজাতকের স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক মাকে দোষারোপ করা ও মায়ের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। (যেমন-বাচ্চা এত শুকনো কেন, কিছু খাওয়াও না, বাচ্চার যত্ন জানো না, কিসের মা হয়েছো তোমরা, আমরা মা হই নি! আত্মীয় স্বজন কর্তৃক এমন তিক্ত ও কুরুচিপূর্ণ প্রশ্ন মাকে মানসিকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেয়)
• বাচ্চার কোন ভয়াবহ স্বাস্থ্যগত সমস্যা হলে কিংবা বাচ্চার স্পেশাল কেয়ারের প্রয়োজন হলে।
• প্রতিবন্ধী সন্তান জন্মের কারণে মাকে সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে হেয় করা হলে।
• জমজ বাচ্চা জন্মদান ও লালনপালনের জটিলতা।
মানসিক এই সমস্যাগুলো আমাদের দেশে অনেকটাই সাধারণ বিষয় হলেও এই সমস্যাগুলোই একজন মাকে পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেজন্য গর্ভধারণ, প্রসব, সন্তান জন্মদানের আগে ও পরে পরিবারের মানুষজনকে সদ্য মা হওয়া মায়ের পাশে থাকতে হবে। তাকে সহযোগিতা করতে হবে ও বিভিন্নভাবে সাহস দিতে হবে।

পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডারের লক্ষণ
পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো শিশু জন্মের পর থেকে ধীরে ধীরে মায়ের মাঝে দেখা দেয়। কখনো কখনো এটা আলাদা আলাদা মানুষের ক্ষেত্রে ও সময়ের সাথে সাথে প্রকট হয়। আমরা কিছু লক্ষণের কথা জানবো যা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভোগা প্রায় সকল মায়েদের মাঝে দেখা যায়।
• কোন কারণ ছাড়াই মেজাজ খিটখিটে হওয়া ও রাগান্বিত অনুভব করা।
• কোন কাজে মনোযোগ দেয়া কঠিন হয়ে পড়া।
• কোন কিছুতে আগ্রহ না থাকা। এমন কী নিজের পছন্দের কোন কাজেও আনন্দ না পাওয়া।
• অনাকাঙ্খিত ব্যথা, যন্ত্রণা ও অসুস্থতা অনুভব করা।
• খেতে ইচ্ছা না করা ও কখনো কখনো অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া দাওয়ার কারণে খুব কম সময়ে শরীরের ওজন ওঠানামা করা।
• নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো।
• কোন কারন ছাড়াই অত্যধিক কান্নাকাটি করা।
• ঘুম না আসা। এমন কী অনেক ক্লান্ত থাকা অবস্থায়ও ঘুমাতে ইচ্ছা না করে।
• আশেপাশে লোকজন থাকলে বিরক্ত হওয়া। এমন কী বন্ধু ও পরিবারের কাউকেও সহ্য না হওয়া।
• সন্তানের প্রতি কোন ধরণের টান অনুভব না করা, সন্তানের যত্ন নিতে ইচ্ছা না করা।
• কখনো কখনো নিজের ও সন্তানের ক্ষতি করার ইচ্ছা হওয়া। অনেকের মাঝে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতাও দেখা যায়।
• মাঝে মাঝে প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়া।

সাধারণত সন্তান জন্মের ২-৩ সপ্তাহের মাঝে এমন লক্ষণ দেখা দিয়ে আবার চলেও যেতে পারে। কিন্তু লক্ষণগুলো সময়ের সাথে সাথে তীব্র হতে থাকলে দ্রুত মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। সাধারণত চিকিৎসায় এক বছরের মধ্যে সুস্থ হওয়া যায়। আর কোন চিকিৎসকের পরামর্শ না নিলে ৩ বছরের মধ্যে কিছুটা ঠিক হলেও পরবর্তী জীবনে এই সমস্যার জন্য রোগীকে অনেক ভুগতে হয়!

অরনি আর ভিনগ্রহের রোবট রোবেকুবের সাথে  আপনার  সন্তানকে মজায় রসায়ন বিজ্ঞান শেখাতে  রসায়ন রহস্য বিজ্ঞানবাক্সটি সংগ্রহ করুন।

পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা
রোগের তীব্রতা ও রোগীর ধরণের উপর নির্ভর করে মনোচিকিৎসকরা নানান ধরণের চিকিৎসা ও থেরাপি দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো- সাইকোথেরাপি, কাউন্সেলিং, মেডিকেশন ও ইলেক্ট্রোভালসিভ থেপারি।

সাইকোথেরাপি
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি অনেক কার্যকরী একটা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে চিকিৎসক রোগীর অনুভূতি পর্যালোচনা করে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে সবচেয়ে ভালো ও সহজ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে থাকেন।

কাউন্সেলিং
মনোচিকিৎসক রোগীর সমস্যা পর্যালচনা করে বিভিন্ন মেডিটেশন ও নিয়মিত মেন্টাল এক্সারসাইজ ও কিছু লেসনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে রোগীকে সমস্যা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। কাউন্সেলিং আবার দু-ধরণের হয়ে থাকে। যথা-কগনিটিভ থেরাপি (CBT) ও ইন্টারপারসনাল থেরাপি (IPT)।

মেডিকেশন
মনো চিকিৎসকরা মেডিসিনের সাহায্যে রোগীর লক্ষণ কমানো রোগীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।

ইলেক্ট্রোকনভালসিব থেরাপি (ECT)
রোগের অবস্থা তীব্রতর হলে ও কোন ধরণের পদ্ধতি কাজ না করলে কেবল ইলেক্ট্রোকনভালসিব থেরাপির শরনাপন্ন হয়। ব্রেইনে প্রয়োজন মতো ইলেক্ট্রিক শকের সাহায্যে মনো চিকিৎসকরা ব্রেইনের কিছু হরমোনাল পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগীকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনার চেষ্টা করেন।

কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি
পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডার যদিও ঘরোয়া ভাবে সম্পূর্ণরূপে নিরাময় করা সম্ভব নয়। তারপরও যেহেতু রোগটা অনেকটাই মানসিক, সেক্ষেত্রে জীবনধারণে কিছুটা পরিবর্তন ও মন ভালো রাখার মাধ্যমে কিছুটা উপকার পাওয়া সম্ভব। তাছাড়া চিকিৎসা চলাকালীন সময়েও এই নিন্মোক্ত কাজগুলো করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

হেলদি লাইফস্টাইল
শারীরিক ব্যায়াম করা, অন্তত প্রতিদিন হাঁটা, মাঝে মাঝে প্রিয় কারও সাথে হাঁটতে বের হওয়া, প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়া ইত্যাদি ভালোলাগার মত কাজ করা যেতে পারে। এতে মন ও শরীর দু-টাই ভালো থাকবে।

অনুভূতি শেয়ার করা
এই সমস্যাটা এতটাই জটিল যে বেশিরভাগ মা’ই নিজেকে অপরাধী ভাবেন ফলে পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডারে ভোগা মায়েরা এটা প্রকাশ করতে চান না। প্রথমেই মনে রাখতে হবে এটা কোন অপরাধ নয়, মায়েরা ইচ্ছে করে এমনটা করেন না। এটা একটা রোগ, যেটা বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় ৪০ শতাংশ মায়েদের হয়ে থাকে। সেজন্য কোন ধরণের জড়তা কিংবা হীনমন্যতায় না ভুগে অনুভূতিগুলো দ্রুত শেয়ার করতে হবে, সাহায্য চাইতে হবে। পরিচিত কেউ এমন সমস্যায় আগে ভুগলে তার কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। তাছাড়া ইউটিউবে সার্চ দিলে প্রচুর ভিডিও পাওয়া যাবে, যেখানে পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডারে ভোগা মায়েরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন।

নিজেকে সময় দিতে হবে
নিজেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সময় দিতে হবে। সাজতে ইচ্ছে করলে পছন্দের কাপড় পড়া যেতে পারে, প্রিয় মানুষের সাথে বাইরে গিয়ে প্রিয় কোন খাবার খাওয়া যেতে পারে। মোট কথা নিজের যা যা করতে ভালো লাগে তা তা করা যেতে পারে। তাহলে মন ও মানসিকতা ভালো থাকবে।

কোন নতুন মা পোস্টপার্টাম ডিসঅর্ডারে ভুগলে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে মায়ের পাশে থাকতে হবে। তাকে সাহস দিতে হবে। পরিবারের সবার সাহায্য ছাড়া একজন মায়ের এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেকটাই দুরূহ হয়ে পড়ে।

প্লিজ হাসিখুশি থাকুন, ভালো রাখুন আপনার সন্তানকে। তার জন্যে বাংলাদেশের প্রথম সায়েন্স কিট বিজ্ঞানবাক্স নিয়ে আসবে সুন্দর সময়!

বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র সায়েন্স কিট অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স আপনার সন্তানের অবসর সময় সুন্দর করবে, এবং তার মেধা বিকাশে সাহায্য করবে। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

তথ্যসূত্র-webmd , wikipedia   

346 total views, 1 views today

What People Are Saying

Facebook Comment